News Bangla

২৭ মে যশোরের শার্শার কাশীপুরে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল

সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।

কাশীপুর শার্শা থানার একেবারে উত্তরের একটি গ্রাম। যশোর শহর থেকে টানা ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে। এখানে একটি বিওপি আছে। তার উত্তর-পশ্চিম পাশে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ মহকুমার বাগদা থানার বয়রা বাজার। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে একটি সাব সেক্টর খোলা হয়েছিল। ভারতের বয়রা এলাকা থেকে ছুটিপুর-মোহাম্মদপুর দিয়ে যশোর শহরে পৌঁছানোর জন্য কাশীপুর এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করা প্রয়োজন। তাই কাশীপুর এলাকায় প্রতিরক্ষা গ্রহন কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাশীপুর বিওপি মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় পাকিস্তানি বাহিনী কাশীপুর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্রামবাসীর উপর শুরু থেকেই অমানুষিক অত্যাচার চালাতো। ঝিকরগাছার ছুটিপুর বাজার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী পশ্চিম দিকে মুখ করে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছিল এবং এর মাধ্যমে তারা বয়রা-ছুটিপুর-মোহাম্মদপুর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করেছিল।

পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা নিরীহ গ্রামবাসীর উপর অত্যাচার চালাতো। এর সমুচিত জবাব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ১৯৭১ সালের ১৫ মে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা কাশীপুর বিওপি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাটহলের উপর আক্রমণ চালিয়ে ৬ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে এবং ১টি জিপ ধ্বংস করে দেয়।

ছুটিপুর গ্রামের লজ্জাজনক পরাজয় পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিশোধের নেশায় উম্মাদ করে তোলে। তাই ১৯৭১ সালের ২৭ মে ২৪ ফ্রন্ট্রিয়ার ফোর্সের ২টি কোম্পানি ছুটিপুর থেকে কাশীপুর আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তখন দুপুর প্রায় ১২টা। এ সময় বয়রা ক্যাম্পে অবস্থানকারী ‘ডি’ কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। হঠাৎ করে কাশীপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোয়াক্কেল মোল্লা দৌড়ে বয়রা ক্যাম্পে এসে জানায় যে, আনুমানিক ২০০ জন পাকিস্তানি সেনা কাশীপুর এলাকা আক্রমণের উদ্দেশ্যে ছুটিপুর-বেলতা কাশীপুর রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। সংবাদ পেয়েই কোম্পানি অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা সুবেদার মনিরুজ্জামানকে ১ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে ত্বড়িত গতিতে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা বন্ধের নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী কাশীপুর-শার্শা সড়কের কাছাকাছি এগিয়ে আসায় সুবেদার মনিরুজ্জামান তার প্লাটুন নিয়ে কাশীপুর শার্শা সড়ক ধরে দ্রুত প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহন করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধার সম্মুখীন হয় এবং দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। কোম্পানি অধিনায়ক ক্যাপ্টেন হুদা যুদ্ধের তীব্রতা আঁচ করতে পেরে শত্রুুকে কাশীপুর বিওপি’র পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী তিনি নিজে এবং ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহীর নেতৃত্বে কিছু সৈন্য নিয়ে কাশীপুর বিওপি’র পশ্চিম দিক দিয়ে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হন। ইতোমধ্যে সুবেদার মনিরুজ্জামানের প্লাটুন কাশীপুর প্রাইমারি স্কুলের পাশে সুবিধাজনক অবস্থান থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করতে থাকে।

বেলা আনুমানিক দুইটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের প্রাথমিক অবস্থান কাশীপুর শার্শা সড়কের পূর্ব পাশ ছেড়ে আধা কিলোমিটার দূরে বড় পুকুর এলাকায় রাস্তার উভয় পাশে অবস্থান নেয়। সুবেদার মনিরুজ্জামানের নির্ভীক পরিচালনায় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করলে বিশৃঙ্খলভাবে পশ্চাদপসরণ করতে শুরু করে। বিকাল ৩টার দিকে শত্রুুরা বড়পুকুর হতে মাত্র দেড় কিলোমিটার পূর্বে চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় বিশৃঙ্খলভাবে অবস্থান নেয়। এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে হাতাহাতি যুদ্ধের সূচনা হয় এবং সুবেদার মনিরুজ্জামান বীরবিক্রমে ঝাপিয়ে পড়েন শত্রুুর উপর। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর বটগাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুু মাত্র ৪-৫ গজ দূর থেকে সুবেদার মনিরুজ্জামানকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তিনি সাথে সাথে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। যুদ্ধের পর কাশীপুরেই সমাহিত করা হয় মনিরুজ্জমানকে। বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ এবং সুবেদার মনিরুজ্জামান চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কাশীপুর বয়রা সীমান্তে।

সুবেদার মনিরুজ্জামানের আকস্মিক মৃত্যু মুক্তিযোদ্ধাদের হতভম্ব করে দিলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দ্বিগুণ পরাক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুুর উপর। ইতোমধ্যে কোম্পানি অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা পশ্চিম দিক দিয়ে শত্রুুর উপর আক্রমণ করলে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে ছুটিপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ কিলোমিটার পথ ধরে পালাতে থাকে এবং পরবর্তী সময় তারা আর কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। পালানো সময় তারা মৃতদেহ, অস্ত্র এবং যানবাহন রাস্তায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ফেলে যায়। পরবর্তী সময় রণাঙ্গন থেকে ৬০ জন পাকিস্তানি সেনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে তিনজন। এছাড়া একটি রকেট লাঞ্চারসহ ৩০টি চাইনিজ রাইফেল পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া ৪টি ট্রাক এদিন মুক্তিবাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়। মুক্তিবাহিনীর পক্ষে মাত্র ১ জন শহীদ হন।