News Bangla

হেফাজতের শাপলা চত্বরের তান্ডব ৮ বছর পর আইনের আওতায়

সেই ৫ মে। আট বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরসহ বায়তুল মোকরাম ও পল্টন এলাকায় বেপরোয়া তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলাম। ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের নামে অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি দিয়েছিল তারা। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীতে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫৩টি মামলা দায়ের করে। আসামি করা হয় হেফাজতের শীর্ষ স্থানীয় নেতাসহ কয়েক হাজার কর্মীকে। মামলার এজাহারে নাম ছিল বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতারও। কিন্তু সে সময় অল্প কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হলেও আইনের আওতায় আসেনি বেশিরভাগই। আট বছর পর হেফাজতের সেই সব নেতাকর্মীকে আইনের আওতায় আনছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে ২০১০ সালে নারী নীতির বিরোধিতা করে আলোচনায় আসা হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে’র তাণ্ডবের পরও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। কিন্তু আট বছর পর সরকারের কঠোর পদক্ষেপে ভেঙে পড়েছে হেফাজতে ইসলাম। মোদিবিরোধী আন্দোলনের নামে সাম্প্রতিক সহিংসতায় সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে কমিটিও ভেঙে দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হেফাজত বর্তমানে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে সরকার আগের মতো হেফাজত নেতাদের আর পাত্তা দিচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেফাজতের মধ্যে যারা সহিংসতায় জড়িয়েছে, তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাদের আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের সঙ্গে সমঝোতারও কিছু নেই।’ যদিও আগে দুই দফা মিটিংয়ের পরও মঙ্গলবার (৪ মে) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা জন্য বৈঠক করেছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে’র তাণ্ডবের ঘটনায় ৫৩টি মামলার মধ্যে ৪টি মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। বাকি ৪৯টি মামলার মধ্যে ১৭টি মামলা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এবং ৩২টি মামলা পল্টন ও মতিঝিল থানা পুলিশের কাছে তদন্তাধীন রয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এত দিন মামলাগুলোর তদন্ত থমকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার কারণে পুরানো মামলাগুলো আবারও সচল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

হেফাজতের শাপলা চত্বরের তান্ডব ৮ বছর পর আইনের আওতায়

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত দুই ডজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত নেতা মামুনুল হকও রয়েছেন। তাদের পুরানো বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মুফতি ফখরুল ইসলাম নামে এক হেফাজত নেতা ৫ মে তাণ্ডবের আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা, হাবীবুন নবী খান সোহেল, জামায়াত নেতা মজিবর রহমান মঞ্জু অর্থায়ন করেছিলেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এছাড়া বিএনপির আরেক নেতা ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে শাপলা চত্বরের অবরোধে অর্থ দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তারা। মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার কাজ চলছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, ৫ মে অবরোধ কর্মসূচির আড়ালে হেফাজতে ইসলাম রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার পরিকল্পনা করেছিল। এ জন্য তারা হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব ও সদ্যবিলুপ্ত কমিটির আমীর আল্লামা জোনায়েদ বাবুনগরীকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করে একটি মন্ত্রিপরিষদও গঠন করেছিল। ওই মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন সম্প্রতি যৌন কেলেঙ্কারিতে আলোচনায় আসা মাওলানা মামুনুল হক। কিন্তু হেফাজতের অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সরকারের সহমর্মিতা ও রাজনৈতিক কৌশলের সুযোগ নিয়ে হেফাজতে ইসলাম দিনকে দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। এমনকি আফগানফেরত মুজাহিদসহ নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ ও আনসার আল ইসলামের অনেক নেতাদের এই সংগঠনে যুক্ত করা হয়। চিহ্নিত হরকাতুল জিহাদ নেতা হারুণ ইজহারকে এই সংগঠনের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক করা হয়। হারুণ ইজহারের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম উগ্রপন্থীদের কজ্বায় চলে গিয়েছিল। হারুণ ইজহারকে হেফাজতে মানহাজিদের নেতা বলেও ডাকা হতো।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে’র তাণ্ডবের ঘটনায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এইসব মামলায় অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ সূত্র-বাংলা ট্রিবিউন।