News Bangla

লকডাউন শিথিল হলে মহামারি নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা মহামারিকালে গতকাল রবিবার সর্বোচ্চ ২৩০ জনের মৃত্যু এবং আজ সোমবার সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৭৬৮ জন শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে। আজ মারা গেছেন ২২০ জন। এ খবরের পরও দেশে কঠোর বিধিনিষেধের শর্ত শিথিল হতে পারে বলে মন্ত্রিপরিষদ সূত্র জানিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত দেশে করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেবে বলে জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, গত ঈদের রেশ এখনও চলছে, এর ভেতরে সব খুলে দেওয়া হলে এর পরিণতি কী হবে বলা মুশকিল।

শিথিল হতে যাওয়া লকডাউনের ভেতরে চলবে গণপরিবহন, খুলবে শপিং মল। একইসঙ্গে আগামী ১৭ ‍জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে কোরবানির পশুর হাট, চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। এদিকে, দোকান খোলা রাখতে দোকান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি দাবি জানিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলমান লকডাউন আগামী ১৪ জুলাই মধ্যরাতের পর আবারও ২৩ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে কোরবানির ঈদের বিবেচনায় লকডাউনের শর্ত শিথিল হতে পারে। খুলে দেওয়া হতে পারে দোকানপাট, শপিং মল। অনুমতি দেওয়া হতে পারে গণপরিবহন চলাচলের। তবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ২৩ জুলাইয়ের পর আবারও কঠিন লকডাউনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানিয়েছে সূত্র।

সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে সরকার। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সাধারণ মানুষের আর্থিক দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকার চলমান লকডাউনের মেয়াদ ২৩ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়িয়ে বিধিনিষেধ শিথিল করার কথা ভাবছে।

এদিকে, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার রাজধানীতে ১৯টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯টি হাট বসবে। আগামী ১৭ জুলাই থেকে এসব হাটে পশু কেনাবেচা শুরু হবে। দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ঈদে গরু ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের কথা বিবেচনা করে লকডাউনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

যদিও কোরবানির আগে এ পশুর হাট না বসানোর সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত স্থানে কোরবানির পশুর হাট বসবে। এর বাইরে হাট বসতে দেওয়া হবে না বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানিয়ে অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম গত ৫ জুলাই বলেন, ‘তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর সুপারিশ করেছে কোরবানির হাট ফিজিক্যাল না করে অনলাইনে করতে।’

গত বছর কোরবানির পশুর হাট ফিজিক্যাল হওয়ার কারণে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যায় মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় লাগে। যে কারণে এবার কোরবানির পশুর হাট ফিজিক্যাল না করে অনলাইনে করার সুপারিশ করেছি।’

গত বছর করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম শহরে কোরবানির পশুর হাট না বসানোর সুপারিশ করেছিল কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর গতকাল (১১ জুলাই) চলমান কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে যারা অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন তাদের আরও কঠোর আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছিল।

গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে এভাবে যদি রোগী সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে তাহলে সবাইকে বিপদে পড়তে হবে জানিয়ে অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন জানিয়েছেন, আগামী সাত থেকে ১০ দিনের ভেতরে হাসপাতালে কোনও সাধারণ বেড এবং আইসিইউ ফাঁকা থাকবে না।

ভবিষ্যতে করুণ অবস্থা হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের ভিড় থেকেই আসলে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। আর সংক্রমণের উৎস অরক্ষিত রেখে কাউকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য মাস্ক পরতে বলা ঠিক নয়।’

অপরদিকে, কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কঠোর লকডাউনেই কেউ ঘরে থাকেনি। নানা অজুহাতে বাইরে বের হয়েছে।’ আর সেখানে কঠোর লকডাউন শিথিল হলে কী হবে সে অবস্থা বোঝার জন্য কোনও রকেট সায়েন্স দরকার নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত আর সর্বোচ্চ মৃত্যু হচ্ছে। সেখানে কী করে এই শপিং মল খুলে দেওয়া, পশুর হাট বসানোর মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে সেটা বোধগম্য নয়।’

এসব সিদ্ধান্তই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত মহামারি ছড়াতে সাহায্য করবে, রোধ করতে নয়।’ আর কারিগরি কমিটির যেসব সুপারিশ ছিল তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কঠোর বিধিনিষেধের পরেও দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ কমার ট্রেন্ডও এখনও তৈরি হয়নি জানিয়ে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সর্বাত্মক বিধিনিষেধের ১২তম দিনে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হলো। শনাক্তের হার ৩১-এর ঘরে, মৃত্যু ২০০ পার হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানগুলোর ভেতরেও গ্যাপ রয়েছে। এ ছাড়া দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দিকে যায়নি।’

‘আর বিধিনিষেধ শিথিল করার কথা যেটা বলা হচ্ছে, তাকে ব্যক্তিগতভাবে আমি শিথিল করার কথা কোনোভাবেই মনে করি না, এটা পুরোটাই আইওয়াশ। আগামী ১০ দিন স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করবে এবং বর্তমান অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই’, বলেন অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান।