News Bangla

রোজিনা যদি নথি চোর হয় তাহলে প্রায় সব সাংবাদিকই মূলত নথি চোর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফজলুল বারী।।

রোজিনা যদি নথি চোর হয় সচিবালয় বিটের প্রায় সব সাংবাদিকই মূলত নথি চোর। কারন এসব নথি কেউ না কেউ চুরি করে তাদের হাতে দিয়েছেন বা নিয়েছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগেপরে অনেক সাংবাদিকদের হাতে নথি চলে আসে। তখন বলা হয় অমুক অমুক সাংবাদিকের সোর্স ভালো। ছাপা রিপোর্ট ধরে ধরে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন।

আওয়ামী লীগ বিরোধীদলে থাকতে অনেক নথি আমি আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পেতাম। আওয়ামী লীগ সমর্থক আমলারা ভবিষ্যতের ভালোবাসার পথ করে রাখতে এসব নথি তাদের দিতেন। আর নেতারা বিষয়টি মিডিয়ায় আনতে তা দিতেন আমাদেরকে। জাতীয় সংসদের কত বিতর্ক এভাবে সৃষ্টি হয়েছে!

এখন সোর্সরা অনেক ক্ষেত্রে নথি না দিয়ে ছবি তুলে আনতে দেন। সচিবালয় বিটের ঝানু সাংবাদিকদের সিংহভাগের ফোনে এমন নথির পাতার পর পাতার ছবি পাবেন। বুদ্ধিমানদের অনেকে এসব ছবি এক পর্যায়ে ডিলিট করে দেন। বোকা রোজিনা শুনেছি এসব সহজে ডিলিট করতেননা।

রোজিনার পূর্বাচলের প্লটের গেজেটের একটা ছবি এখন অনলাইনে ঘুরছে। আরও অনেক সম্পদের তালিকাও! বেতন ধরা হয়েছে ৩০ হাজার! সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড অনুসারে বেতন সম্পর্কে ধারনার অভাব থাকায় বেতন এত কম ধরা হয়েছে। ২০০৭ সালে বিশেষ সংবাদদাতা হিসাবে আমার বেতন ছিল ২৭ হাজারের একটু বেশি। এখনকার বিশেষ সংবাদদাতাদের বেতন এর কয়েকগুন। এখন দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যে প্রথম আলো ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি বেতন পান।

এবং তারা বেতন নিয়মিত পান। বোনাস পান একাধিক। তাদের গাড়ি তেল ড্রাইভার খরচও পত্রিকার। কারন পত্রিকা দুটির আয় বেশি। আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপন বেশি প্রচারের আশায় আপনারা প্রথম আলোতে দেন। সর্বশেষ বাংলাদেশে গিয়ে দেখেছি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বেশিরভাগের বাড়িতে প্রথম আলো রাখা হয়। আর বাংলাদেশের বিদেশী দূতাবাস, দাতা সংস্থাগুলোর অফিসের প্রধান পত্রিকার নাম ডেইলি স্টার। তাদের বিজ্ঞাপনও পত্রিকাটি পায়।

আমার সহকর্মী বা সিনিয়র জুনিয়র খুব কম সাংবাদিক আছেন যারা পূর্বাচলে অথবা সরকারি প্লট পাননি। আওয়ামী লীগ বিএনপি আমলে দল বিবেচনায় যেমন এমপি সহ গুরুত্বপূর্ণ নানা লোকজনকে প্লট দেয়া হয়। তেমনি দেয়া হয় দলীয় সাংবাদিকদের। আমি কোন দিন প্লট পাইনি। কারন দলীয় বিবেচনা না থাকায় আমি যেমন জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পাইনি তেমনি সরকারি প্লটও নয়।

আরেক কারনে প্লটের চেষ্টা করিনি। কারন প্লটের আবেদনের সংগে যে টাকা জমা দিতে হয় সে টাকা আমার কখনো ছিলোনা। এসব নিয়ে আমার কোন দিন কোন আক্ষেপও ছিলোনা বা এখনও নেই। আমি শুধু সব সময় কাজ করে গেছি। রিপোর্টের কারনে আমি দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি বা এখনও পাই। আমার হয়ে আমার অনুজ বন্ধু উত্তম চক্রবর্তী রিপোর্টারস ইউনিটির প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন।

উত্তম আমাকে অনেক ভালোবাসেন বলে এই সমবায় সমিতিতে আমার চাঁদাও নিয়মিত দেন। বহুবছর ধরে এই গৃহায়ন প্রকল্পের কাজ হবে হচ্ছে শুনছি। কবে হবে তা কেউ জানেনা। কারন আওয়ামী লীগ হয়তো দলটাই এমন! এরা মালিকদের আঁচল ভরে দেয়। মালিকরা সাংবাদিকদের বেতন দেননা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুস্থ সাংবাদিকদের মাঝে মাঝে চেক দেন। দলের সাংবাদিকরা এতে তার প্রশংসা করে ফেসবুকে পোষ্ট দেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক মালিকরা কেনো সাংবাদিকদের বেতন দেননা বা নিয়মিত দেননা এর কোন উত্তর নেই। এদের কোন পত্রিকা অবশ্য এখন চলেওনা।

জিয়া ক্ষমতায় এসে মিরপুরে সাংবাদিক পল্লী করে যাদের প্লট দিয়েছিলেন! ঢাকায় একমাত্র সাংবাদিক পল্লীটি জিয়ার তৈরি। বংশপরষ্পরায় সেখানকার বাসিন্দা সাংবাদিকরা তাই বিএনপি জামাত করে। আওয়ামী লীগ কোনদিন এটা নিয়ে ভাবেনি। হয়তো ভেবেছে সবতো তাদের গোলাম! আওয়ামী লীগের, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংবাদিক নাম দিয়েছি, এটা ভাবতেইতো সবার আরাম। প্লট পল্লী করে দেবো কেনো!

একটি প্লট কাহিনীর গল্প বলি। ১/১১’র সময় আওয়ামী লীগের সহ দফতর সম্পাদক আব্দুল মান্নান খান সিডনি এসেছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে নিয়ে একটা রিপোর্ট করার অনুরোধ করেন। আমি তাদের বলি ঢাকায় আওয়ামী লীগের এত বাঘা বাঘা নেতা। সহ দফতর সম্পাদকের নিউজ জনকন্ঠ ছাপবেনা। সেই মান্নান খান আবার শেখ হাসিনার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য ছিলেন। নেতারা তাকে ক্যানবেরায় নিয়ে লেবার পার্টির একাধিক নেতার সংগে বৈঠক করিয়ে দেন।

আমি অনুরোধ রাখতে একটা ছোট রিপোর্ট বানালাম ‘অস্ট্রেলিয়া চষে বেড়াচ্ছেন শেখ হাসিনার আইনজীবী’। খবরটা জনকন্ঠের ভিতরের পাতায় ছাপা হয়। সেই মান্নান সাহেব তাতেই খুশি হন। একদিন শেখ হাসিনা আদালতে হাজিরা দিতে এলে সেই নিউজটা আন্ডারলাইন করে তাকে ধরিয়ে দেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে আব্দুল মান্নান খানকে পূর্তমন্ত্রী করা হয়। এটা অনেকের হিসাবে মিলছিলোনা। এরপরে শুনেছি আমাকে দিয়ে যারা রিপোর্ট করিয়েছিলেন তাদের কেউ কেউ তার হাতে প্লট পেয়েছিলেন। এরপর মান্নান খানের স্ত্রীকেও তাদের আতিথ্যে সিডনি বেড়াতে দেখেছি। এভাবে সাংবাদিকদের বদনাম দেয়া সবচেয়ে সহজ। সাংবাদিকদের বদনাম গাইতে সাংবাদিকও পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আর সবাই ফেরেশতা। ভুল করে এখনও পৃথিবীতে বাস করেন।