News Bangla

বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাঙালির সবচেয়ে বড় মুখ সত্যজিৎ রায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাঙালির সবচেয়ে বড় মুখ সত্যজিৎ রায়। রবিবার তার শততম জন্মবার্ষিকী। করোনার আবহে আনুষ্ঠানিকতায় কমতি থাকলেও দুই বাংলার সিনেপ্রেমীরা তাকে নানাভাবে স্মরণ করছেন।

চলচ্চিত্রকার, আলোকচিত্রী, চিত্রকর, শিশুসাহিত্যিক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত সত্যজিৎ রায়। সৃজনশীলতায় তিনি এখনো অনন্য ও নতুন। প্রয়াণের তিন দশক পার হলেও তার আবেদন দিন দিন বেড়েই চলেছে যেন। দুই বাংলার নির্মাতার কাছে এখনো অনুপ্রেরণা সত্যজিৎ।

১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের মসুয়া গ্রামে।

সত্যজিতের পরিবারের কয়েক প্রজন্ম সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাবা প্রখ্যাত লেখক, সম্পাদক ও আলোকচিত্রী সুকুমার রায় এবং মা সংগীতশিল্পী ও হস্তশিল্পে পারদর্শী সুপ্রভা রায়। সত্যজিতের দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত লেখক, শিশু সাহিত্যিক, চিত্রকর, আলোকচিত্রী, ব্লক ডিজাইনার এবং শিশুতোষ পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদক। সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ রায় চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত।

কলকাতার বালিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বি.এ পাসের পর ১৯৪০ সালে সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন।

১৯৪৩ সালে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা ও ডিজাইনে তিনি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। প্রায় একই সময়ে বইয়ের প্রচ্ছদ ও পত্রিকায় ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় গঠন করেন কলকাতা চলচ্চিত্র সংসদ। পরবর্তী বছরে তার সুযোগ ঘটে ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ রেনোয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। রেঁনোয়া তার পরিচালিত ‘দ্য রিভার’ ছবির কিছু অংশ কলকাতায় শুটিং করেন এবং সেই সেটে উপস্থিত ছিলেন সত্যজিৎ।

সত্যজিৎ রায়

১৯৫০ সালে চাকরির সূত্রে পাঁচ মাস লন্ডনে অবস্থানকালে সত্যজিৎ প্রায় একশ চলচ্চিত্র দেখেন এবং পরিচিত হন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ পেনেলোপি হাস্টন ও গ্যাবিন ল্যাম্বটির সঙ্গে। ইতালির ভিত্তোরিও ডি সিকা পরিচালিত ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ অবলম্বনে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পায়। মুক্তির পরপরই ছবিটি সারা বিশ্বে প্রশংসা লাভ করে এবং পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করে। নবম কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল’ বা প্রিক্স দু দকুমেন্ট হুমাইন পুরস্কারে ভূষিত হয়।

১৯৫৬-তে মুক্তি পায় দ্বিতীয় ছবি ‘অপরাজিত’, এটি সত্যজিৎকে এনে দেয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, গোল্ডেন লায়ন ও ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার।

সত্যজিতের চলচ্চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্র, ৫টি তথ্যচিত্র ও ৩টি টেলিফিল্ম। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো— পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), পরশপাথর (১৯৫৭), জলসাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সিকিম (১৯৭১), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), ইনার আই (১৯৭৪), জনারণ্য (১৯৭৫), বালা (১৯৭৬), শতরঞ্জ কি খিলাড়ি (১৯৭৭), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), পিকু (১৯৮২), সদগতি (১৯৮২), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), সুকুমার রায় (১৯৮৭), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০) ও আগন্তুক (১৯৯১)। এ ছাড়া তিনি অনেক ছবির চিত্রনাট্য রচনা ও সংগীত পরিচালনা করেন।

এর মধ্যে ‘অশনি সংকেত’-এর নায়িকা ছিলেন ঢাকার ববিতা।  ছবিটি বার্লিনে গোল্ডেন বিয়ার ও শিকাগোতে গোল্ডেন হিউগো পুরস্কার লাভ করে। সত্যজিৎ ৬৪তম অস্কারে একটি সম্মানসূচক পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া ভারতের সরকারি-বেসরকারি পর্যায় এবং আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।

লেখক হিসেবেও সত্যজিৎ রায় খ্যাতি অর্জন করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— বিষয় চলচ্চিত্র, একেই বলে শুটিং, আওয়ার ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস, ফেলুদা সিরিজ, শঙ্কু সিরিজ, পিকুর ডায়েরি ইত্যাদি। তার লেখা থেকে আজও নির্মিত হচ্ছে সিনেমা, টিভি ও ওয়েব সিরিজ।

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু হয়।

সূত্র-দেশরূপান্তর।