News Bangla

ধীরে ধীরে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নাজনীন সীমন।  ২৮ বছরে আমরা ১৬(২)
ধীরে ধীরে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে
একেবারে ব্যক্তিগত কথায় আসলে বাবা এবং মা দু’জনই প্রচণ্ড রাগী ছিলেন কিন্তু দু’জনের ক্ষেত্রে তার প্রকাশ ছিলো ভিন্ন। বাবা চট করে রেগে গিয়ে কিছুক্ষণ চেঁচালেই রাগ গলে নদীর শান্ত টলটলে জল হয়ে যেতো। মনেই হতো না এই মানুষটি একটু আগে এতো রেগে গিয়েছিলেন। আর মা পুরো বিপরীত। সহ্য করতে করতে যখন সহন ক্ষমতা অতিক্রম করতো, তখন তাঁর রাগের প্রকাশ ঘটতো এবং তা ছিলো চরম। তবে দু’জনেই প্রচণ্ড জেদী ছিলেন এবং কোনো কিছু না করার সিদ্ধান্ত নিলে কারো ক্ষমতা ছিলো না সে কাজ করায়। কিন্তু মা বারবার সুযোগ দিতেন শোধরানোর, আর বাবা কষ্ট পুষে রাখতেন। বহু অন্যায় বাবা নীরবে সহ্য করে গেছেন, অভিমান করেছেন, কিন্তু মুখে কাউকে কিছু বলেননি। মা নিজের প্রতি করা অন্যায় সহ্য করেছেন কিন্তু অন্যের প্রতি অন্যায়কে কখনও প্রশ্রয় দেননি বরং রুখে দাঁড়িয়েছেন স্বভাবতই যা বেশীর ভাগ মানুষের অপছন্দ হবার কথা। ফলে আত্নীয় স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী, বন্ধু ভুক্তভোগীদের অভয়াশ্রম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

সহন ক্ষমতা ও রাগের একটি ঘটনা এখনও চোখে ভাসে পরিষ্কার। মনে হয় এই তো ঘটছে আমার সামনে। শীতকাল চলছে। আমরা তখন দুই ভাইবোন; ছোটো ভাইটির বয়স বছর দেড়েক। থাকি বহুতলা সরকারী কলোনীর চারতলা বিল্ডিংয়ের দুই তলায়; আর আমাদের ঠিক উপরেই থাকে চার সদস্যের এক পরিবার–শিশু সন্তানটি আমার ভাইয়ের বয়সী; চতুর্থ সদস্যটি বাড়ির কাজে সাহায্যকারী একটি মেয়ে,বয়স হয়তো তেরো কি চৌদ্দ। ভদ্রলোক, আমরা কাকা বলে ডাকতাম, কাস্টমসে কাজ করতেন এবং তাঁর স্ত্রী যাঁকে ‘ফুটবল কাকী’ (গোপন নাম) ডাকতাম যাঁর গাত্রবর্ণ ছিলো ধবধবে ফর্সা। তিনি ছিলেন বেশ বেঁটে ও গোলগাল মুখের অধিকারী। দৈর্ঘ্য প্রস্থে প্রায় সমান বলেই বোধ করি এই নাম দিয়েছিলাম। হয়তো গাত্রবর্ণের কারণে তিনি অহঙ্কারী ছিলেন বেশ। তার চেয়ে বড়ো কথা বেশ অ-সভ্য প্রকৃতির ছিলেন। বিল্ডিংয়ের কারো সাথে তো তিনি মিশতেনই না, বহুবার ভিক্ষুকদের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এটা সেটা বলতে শুনেছি এবং প্রায়ই শুনেছি গৃহকর্মীর কান্না। যেহেতু কারো সাথে তাঁর ওঠাবসা ছিলো না, হয়তো সে কারণেই কেউ কখনও জিজ্ঞেস করতে পারেনি মেয়েটি অমন কাঁদে কেনো। সব মিলিয়ে ধারণা করি তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে একেবারেই অশিক্ষিত ছিলেন এবং সামাজিকতাজ্ঞানশূন্য ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন কোনো ব্যাপার না হলেও মানুষের উপর কিছু প্রভাব পড়ে এর কারণে। তখন সব স্বাভাবিক মনে হলেও এখন চিন্তা করি, হয়তো অমন সুন্দর গায়ের রং এর জন্যই কৈশোরত্তীর্ণ হতে না হতেই তাঁর বিয়ে হয়েছিলো এক সরকারী চাকুরের সাথে। ওনার পোষাকেও মানে শাড়ি নির্বাচন ও পরার ধরনেও অনাধুনিকতার ছাপ ছিলো অন্তত সেই সময়ে আধুনিক ও রুচিসম্মত বলে আমরা যা জেনেছি, যদিও আধুনিকতা ব্যাপারটাই গোলমেলে।

ছোটো বেলায় ফুফু ও খালাকে যেমন পাজামা পরতে দেখতাম, ওটাই সবচে’ আধুনিক মনে হতো। অথচ ফ্রক ছেড়ে পাজামা ধরতে ধরতে ঐ হাঁটুর দিকে চাপা আর পায়ের পাতার দিকে প্রায় হাতখানেক ছড়ানো ধরনগুলো পুরনো হয়ে গেলো, এলো নতুন ছাঁট। সেই থেকে কতো যে কাট ছাঁট এলো আর গেলো! কোনো একটায় অভ্যস্ত হতে না হতেই নতুন কিছু বাজারে এবং ফ্যাশন সচেতন আমার আত্নীয় বন্ধুরা সাদরে গ্রহণ করতো সে পরিবর্তন। ঘুরতে ঘুরতে সেই ছড়ানো পাজামা কিঞ্চিত পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগিয়ে এলো ডিভাইডার নামে–তখন বোধ হয় আমি দ্বাদশ শ্রেণীতে। ঘুরে ঘুরে চোজ পাজামা আরো পরিবর্তিত হয়ে এলো চুড়িদার নামে, ডিভাইডার হয়ে গেলো প্লাজো, এলো প্যান্টকাট পাজামা। সত্যি বলতে কি এতো নামধাম আমি কোনো দিনই শিখে উঠতে পারিনি আর নতুন বলেই কিছুকে গ্রহণ করতে হবে তেমনটা কখনোই মনে হয়নি। সবচেয়ে বড়ো কথা, সামান্য এদিক ওদিক পরিবর্তন করে পুরনো জিনিসই ঘুরে ফিরে আসে বলে আমি মনে করি। আজ যেটা সবচেয়ে হালের পোষাক বলে পরিচিত, কিছু দিন বাদে সেটিই হয়ে যায় পুরনো এবং বেশ অনেকটা সময়ের ব্যবধানে আবার ফিরে আসে। পোষাকের আধুনিকতা তবে কি? আমার পোষাক যিনি তৈরী করে দেন এখন, যাঁকে আমি জ্বালাই যখন তখন কাপড় দিয়ে এবং দুই একদিনের মধ্যে ফেরত চেয়ে এবং যিনি সব কাজ ফেলে রেখে হলেও আমারটা করে দেন যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে, সেই কমলদা প্রতিবার নতুন নতুন কাটছাঁট দেখিয়ে আমার পুরনোতেই থেকে যাওয়ায় ক্লান্ত হয়ে বোধ হয় সবচেয়ে সঠিক কথাটি বলেছিলেন আমার সম্পর্কে, “আপারে নিয়া চিন্তা নাই। সবাই পরতাছে নতুন সব জিনিস আর আপা পুরানাতেই আছে”।

প্রতিবার দেশে গিয়ে এই নতুন নতুন ধরনের সাথে খাপ খাওয়াতে সত্যি আমি পারিনি। কিন্তু তারও চেয়ে বড়ো কথা, আধুনিক নামে যা চালানো হচ্ছে তা সাদামাটাভাবে ‘পুনর্ব্যবহার’ বা ‘রিসাইক্যাল’ বই কিছু মনে হয় না আমার এবং এটি যে পুরোপুরি আমার চিন্তা তা নয়; মায়ের মুখেই প্রথম শুনি এমন কথা। আধুনিক ফ্যাশনের রোজ রোজ পাল্টে যাওয়ার সাথে তাল মেলানোতে আজও আমি অনভ্যস্ত। পোষাক ও আধুনিকতা নিয়ে আমার কিছু প্রশ্নও রয়েছে। নারীদের পোষাকে এই যে এতো শত ঘুলঘুলি, বারান্দা ইত্যাদি ইত্যাদি কার মাথা থেকে আসছে এসব? আমি ঢাকায় প্রথমে যে দোকান থেকে কাপড় তৈরী করাতাম, প্রায় বছর চারেক পর সেখানে গিয়ে দেখি এখন আর তৈরী করা জামা পাজামা, ব্লাউজ ঝুলছে না। ঝুলছে না মানে একটিও না। তার জায়গায় বিভিন্ন ধরনের, যথাসম্ভব বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশের হরেক রকম কাজ করা বোরখা ঝুলছে। ভদ্রলোক নিজেই মালিক এবং হেড টেইলরিং মাস্টার ছিলেন এবং কৈশোরোত্তীর্ণ হবার দাগ ছোঁবার বেশ কিছু আগ থেকেই ওনাকে চিনি বিধায় চাচা ডাকতাম। চাচার চেহারায়ও ব্যাপক পরিবর্তন। সুঠাম শরীর, সুদর্শন চেহারার উপর ঝুলছে পরিপাটি করে কাটাছাঁটা আগাছা নিংড়ানো শ্মশ্রু। দেখতে বেশ লাগছিলো। ওনার কাছে জামার ডিজাইনের ক্যাটলগ চাইলে জানালেন মেয়েদের ইসলামী পোষাক ছাড়া আর কিছু তিনি করেন না। পাকিস্তানী কাবুলী পরা চাচাকে তৎক্ষণাত জিজ্ঞেস করলাম মাপ কে নেয়? তিনি বললেন, আগের মতোই এখনও তিনিই দোকান সামলান; সেলাইয়ের কাজ কর্মচারী করেন। দ্বিচারিতা কি একেই বলে? আপাদমস্তক পুরুষের ‘লোলুপ’ নজর থেকে রক্ষা করে পুরুষজাতিকে স্খলনের যে মহান দায়িত্ব নারীর উপর দেয়া হয়েছে, সেই কর্তব্যভার পালন করতে গিয়ে শরীরের মাপ পরপুরুষকে দিয়ে নেয়ানো কি এই ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়? অপর দিকে যাদের চরিত্র সহজেই দূষিত হতে পারে নারীর ঠোঁট, চোখ, নাক, অঙ্গুলি, বক্ষদেশ, পশ্চাৎদেশ, এমনকি মাথার চুল দেখেও সেই পুরুষের নারীর কটি, বক্ষ ইত্যাদি মাপা কি স্ববিরোধিতা নয়? তেঁতুল তত্ত্বের জনকের আবির্ভাব থেকে এ সময় ঢের দূরের গল্প হলেও দৃঢ় বিশ্বাস করি, ধীরে ধীরে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার যে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে, সাম্প্রদায়িকতার যে নগ্ননৃত্য দেখতে পাই, ধর্মব্যবসার এই যে ফুঁসে ফুলে ওঠা–এক দিনে তো সম্ভব নয়; এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো বেশ আগে থেকে এবং আমরা আজ দেখছি এক বিষবৃক্ষ। ভাষার আগ্রাসন, পোষাকের আগ্রাসন ধীরতিধীরে এমন ভাবে জেঁকে বসেছে আমাদের উপর যে বোধের শিকড় নড়বড়ে হয়ে গেছে।

কথারও সর্বগ্রাসী শিকড় আছে; কোত্থেকে কোথায় যে চলে যায়, কে জানে! সহ্য ক্ষমতা ও রাগের ঘটনায় ফিরে আসা যাক। প্রতিদিন দু’ঘরেই বাচ্চাদের কাঁথা নাড়া হতো বারান্দায় এবং রোজ দিনই তিনি মানে ‘ফুটবল কাকী’ ঘর ধুয়ে বারান্দা দিয় জল ফেলতেন যাতে সব ভিজে যেতো। এখনকার মতো তখন তো আর বাচ্চাদের জন্য ডায়াপার ব্যবহার করা হতো না; শুকনো কাঁথা না থাকলে ভীষণ বিপত্তি ঘটতো। যে দিনের ঘটনা, সেদিন কেবল ভাইয়ের কাঁথাই ছিলো না লেপও ছিলো, শীতের রাতের অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বেলা দেড়টার দিকে তিন তলার বারান্দা বেয়ে নেমে এলো ঘর ধোয়া নোংরা জল এবং ভিজিয়ে দিলো লেপ, কাঁথা সব। মায়ের কানে খবরটা গিয়েছিলো রেশমা খালার চিৎকারে, “ওরে আপা দেইখে যান, সব ভিজেয় দেলো। এই মহিলা রোজ দিন শুরুডা করছে কি?…”। দৌড়ে এলেন মা, ছোটো কাকা এবং এলাম আমি। মায়ের মেজাজ তখন সপ্তমে। আদেশ দিলেন বালতি ভরে জল আনতে। আনা হলো জল। বারান্দার কার্নিশে উঠে দাঁড়াতে বললেন কাকাকে। আদেশ পালন করতেই মগ ভর্তি জল দিয়ে উপরে ছুঁড়ে দিতে বললে কাকা আস্তে করে ‘থাক না’ বলতেই মা বললেন, “তুই পারলে দে, না পারলে নেমে আয়”। কথা শুনেই কাকা আর কিছু না বলে এগিয়ে দেয়া জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভিজিয়ে দিলেন উপরে নাড়া সমস্ত কাপড় এবং ছুঁড়ে মারার কারণে ঘরের ভিতরে জলের ছিটা গিয়ে এটা সেটা, সম্ভবত বিছানাও ভিজে গিয়েছিলো। ফুটবল কাকী চিৎকার শুরু করলেন। বালতি ভরে জল আনছেন রেশমা খালা, মা মগ ভরে তুলে দিচ্ছেন, কাকা ছুঁড়ে দিচ্ছেন উপরে–সে যে কি আনন্দের দৃশ্য ছিলো আমার জন্য! মনে হচ্ছিলো আমি বড়ো হলে আমিই করতে পারতাম এ কাজ। রেশমা খালা নিঃসন্দেহে বহু দিন ধরে রাগ পুষে রেখেছিলেন যেহেতু প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে এই উদ্ভট ঝামেলার জন্য অতিরিক্ত কাজ করতে হতো। ঝাল ঝাড়ার সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে রান্নাঘরে গিয়ে ছাইয়ের টিন নিয়ে তিনি ছুটলেন উপরে এবং প্রচণ্ড উত্তেজনা ও কৌতূহল নিয়ে আমি তাঁর পেছনে পেছনে। গিয়ে যা দেখি তাতে মনে হয়েছিলো সেই বয়সে এতো আনন্দের কিছু আর দেখিনি আগে। মুঠো ভর্তি ছাই নিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছেন খালা দরজার নীচ দিয়ে আর প্রতিবারে রাগের পারদ যেনো একটু একটু করে নামছে। সম্ভবত কৌটা খালি করার আগেই ফুটবল কাকী দরজা খুলে বের হয়ে এলে আমরা হুড়মুড় করে পালিয়ে বেঁচেছিলাম।
ঘটনার শেষ এখানেই নয়। আমাদের কলোনীর আবার একটি কমিটি ছিলো যেখানে বিভিন্ন পদ ছিলো। এই ঘটনার কথা সেখানে গেলো এবং একটি সভা বসলো দুই পক্ষ নিয়ে। কাকা এবং ‘ফুটবল কাকী’ সেখানে তাদের কথা বললেন। পালা আসার পর মা কেবল দুটো কথা বললেন; এই ঘটনা কতো দিন ধরে ঘটছে এবং সরাসরি কাকা ও কাকী দু’জনের সাথে একাধিকবার কথা বলা হয়েছে কিনা। দু’জনেই সম্মতিসূচক উত্তর দেয়ার পর দ্বিতীয় কথায় মা বললেন প্রায় দু’বছর ধরে একই কথা বলার পর যদি এমন ঘটে থাকে, মায়ের জায়গায় থাকলে ওনারা কি করতেন। এখনও মনে আছে বেশ একটু চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো ঘরটি এবং শেষতক ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনতলার কাকা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এমনটা আর হবে না। আর ঘরে ফিরে আমরা দ্বিতীয় দফা বকা খেয়েছিলাম ছাই ছড়ানোর জন্য। বহু পরে পড়তে গিয়ে জেনেছি বটলড আপ রিপ্রেশনের কথা যেখানে মানুষ তার ক্ষোভ, দুঃখ ইত্যাদির প্রকাশ না ঘটিয়ে সহ্য করে চুপচাপ থাকে। সময়ে জমতে থাকা পলি যেমন নদী ভরাট করে তোলে ঠিক তেমনি রাগের ঘড়া পূর্ণ হলে আকস্মিক অল্প কিছুতেও একদিন সেটা ফেটে পড়ে। ভেবে দেখেছি মায়ের এই বদগুণটি উত্তরাধিকার সূত্রে পুরোপুরি আমার স্বভাবে গেঁথে রয়েছে। আবার বাবার কষ্ট পেয়ে চুপচাপ থাকাটাও কিছু অংশে রয়েছে যে কারণে অনেকের অনেক কিছুই হজম করে যাই কখনও বলে লাভ হবে না জেনে আবার কখনও সেই ব্যক্তিটির গুরুত্ব আমার কাছে নেই বলে। অনেক কিছুই দেখি, জানি, বুঝি; মানুষের ছলচাতুরী ধরা পড়ে, দুই নৌকায় চড়া বা গাছেরও খাবো তলারও কুড়াবো ধরনের মানুষদের কাজ দেখে কখনও হাসি, কখনও বা তেতো লাগে খুব, তারপর এড়িয়ে যাই। কিন্তু ঐ যে, পরিবেশ যখন দাবী করে বসে প্রকৃতির সাধ্য কি তাকে অগ্রাহ্য করে! ফলে মাঝে মাঝে বলে ফেলি এবং অপ্রিয় হয়ে উঠি। তবে পরিবেশ আমাকে একটি অসামান্য জিনিস শিখিয়েছে যার ফলে আমি বুঝতে শিখেছি আমাদের সাথেই তেলাপোকা বসবাস করে এবং করবে। “বিলাসী” গল্পে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এ কথাই জানান দিয়েছেন “অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে, তেলাপোকা টিকিয়া রহিয়াছে” বলে। কিছু মানুষ এই তেলাপোকার মতোই লজ্জাবোধহীন; পায়ে পায়ে ঘুরে তেতো করে ছাড়বেই জীবন। নিশ্চিত সহবাস জেনে তাই অল্প বিস্তর উৎপাত সহ্য করে নেই, আর যখন উৎপাত মাত্রারিক্ত হয় তখন তার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করতেই হয় নিজকে বাঁচাতে। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি শুয়োরের সাথে কাদায় নামলে নিজের শরীরে কাদা লাগবেই আর মিথ্যাবাদীরা প্রয়োজনে অন্যের গায়ে শুধু কাদা নয়, কদর্য অসত্যের পাথরে রক্তাক্ত করে তুলতে পারে বিপক্ষে দাঁড়ানো মানুষটিকে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য। অতএব মানসিক প্রশান্তির জন্য নিজকে সরিয়ে নেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করি কেননা চরকির মতো ঘুরতে থাকা জীবনে অসংখ্য মানুষের মন যুগিয়ে চলতে গেলে, সবাইকে খুশী রাখার মহান ব্রত নিলে দিনান্তে নিজের শুষ্ক কঙ্কালখানাও পাওয়া যাবে না; আর নিজেই যদি না থাকি, তো আর কাউকে সুখী করবো কি করে!

উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া বদরাগ এবং জেদ দুটো সঙ্গী করে প্রতিদিনের নানা রঙের মুখোশ পরা মানুষের সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে হয়তো এ আমি অন্য কোনো মানুষ। হয়তো প্রত্যেকেই এমনটা বদলে যায় সময়ের কর্কশ আঘাতে। যে কথা না বললেই নয়, এই ‘ফুটবল কাকী’ যতো দূর মনে পড়ে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন এবং তাঁর খাওয়াদাওয়া, ডাক্তারের কাছে নেয়া সব মা নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। সুস্থ হবার পর তিনি মাকে বোন সম্বোধন করতেন এবং তদানুযায়ী আচরণও ছিলো তাঁর। আজ এটা, কাল সেটা বাটি চালাচালি চলতো দু’ঘরে এবং ক্রমে ‘ফুটবল কাকী’ নাম দেয়ার জন্য লজ্জা পেতে শুরু করলাম যার ফল স্বরূপ আস্তে আস্তে টিকটিকির লেজের মতো নীরবে খসে পড়লো ‘ফুটবল’। যখন কাকার বদলির কারণে ঐ ছোট্ট সরকারী বাসা ছেড়ে যাচ্ছিলেন, মনে আছে, ট্রেন স্টেশনে যাবার জন্য রিক্সায় ওঠার আগে মাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! মানুষ বড়ো বিচিত্র এক প্রাণী! কোথায় যে কখন কিভাবে তার বন্ধন তৈরী হয় আবার কখন তা কিভাবে ছিন্ন হয় বোঝা মুশকিল।

সাম্প্রদায়িকতার এই চরম উল্লম্ফন বন্ধ করতে যথাযোগ্য শাস্তি প্রয়োজন