News Bangla

আপনাদের মনে আছে জনপ্রিয় মডেল এবং ট্র‍্যাজেডি কুইন তিন্নির কথা??

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিলি সুলতানা।।

আজ থেকে ১৫ বছর আগের তিন্নিকে কার কার মনে আছে? সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি । ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে আজ থেকে ১৯ বছর আগে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল অসামান্য রূপসী মাত্র ২৪ বছর বয়সী মডেল তিন্নিকে। আমার কাছে তিন্নিকে পরী পরী মনে হত। মডেল তিন্নিকে টিভির পর্দায় বিজ্ঞাপনে দেখলে আমি ভাবতাম, মানুষ এত সুন্দর হয় কিভাবে? তিন্নি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আর দশজনের মত আমারও কষ্ট হয়েছে। কষ্ট হয়েছে ১৯ বছরেও তিন্নি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার না হওয়াতে। গোলাম ফারুক অভি তিন্নিকে ভোগ করে একসময় তার মন ভরে গিয়েছিল তিন্নির উপর থেকে। তিন্নির স্বামী ফ্যাশন ডিজাইনার শাফকাত হোসেন পিয়াল নিরীহ প্রকৃতির বলে তাকে চুপ থাকতে হয়েছে গোলাম ফারুক অভির ক্ষমতার দাপটের কাছে। ধনীর ছেলে অভি পিয়ালের স্ত্রী তিন্নিকে দখল করে নেয়। পিয়ালকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়েছিল তিন্নি। অভি তিন্নির লিভ টুগেদার চলেছিল কোনো রাখঢাক ছাড়াই। অভি মাঝেমধ্যে বন্য প্রকৃতির হয়ে উঠতেন– এই অভিযোগ ছিল তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুব করিমের। তিনি কয়েকবার তিন্নিকে অভির হাতে মার খেতে দেখেছেন। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি দোর্দণ্ড প্রতাপের অভির বিরুদ্ধে। সৈয়দ মাহবুব করিম বলেছেন, বেডরুমের দরোজা খুলে অভি তিন্নিকে বস্ত্রহীন করে পেটাতেন। আর বিকৃত উল্লাসে মত্ত হতেন।
অভির ব্যাকগ্রাউন্ড অভিজাত। তার ভাই গোলাম সারোয়ার বিবিসি বাংলার জনপ্রিয় সংবাদ পাঠক ছিলেন। অভির মাকে রত্নগর্ভা বলা হত। গোলাম ফারুক অভি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। অভি তিন্নিকে বিয়ে করবেন বলে পিয়ালের সাথে তিন্নির ডিভোর্স করিয়েছিলেন। একসময় তিন্নি আবিস্কার করেন অভি তাকে কোনোদিন বিয়ে করবেনা। শুধু তার সুন্দর ফিগারটা অভির প্রয়োজন। অভির টার্গেট ছিল তাকে ভোগ করে একসময় ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। তিন্নি বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অভির গোপন কান্ড কাহিনী ফাঁস করে দেবেন বলে হুমকি দেন তিন্নি। কিন্তু তিন্নি জানতেন না তার পরিণতি এতটা নৃশংস হবে। মেধাবী পরিবারের পোলা অভি তিন্নিকে হত্যা করেন। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাত্রে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ১ নম্বর চীন মৈত্রী সেতুর ১১ নম্বর পিলারের পাশে তিন্নির মরদেহ পাওয়া যায়। প্রাইভেট কারে উঠিয়ে তিন্নির লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বুড়িগঙ্গা ব্রীজের কাছে। ব্রীজের উপর থেকে লাশ নিচে ফেলে দেয়া হয়। মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। তিন্নির ভাগ্যে জোটে বেওয়ারিশ লাশের খেতাব। হাসপাতালের মর্গে পড়েছিল তিন্নির মৃতদেহ। কেউ ডেডবডি শনাক্ত না করায় আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তিন্নিকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। ব্রীজের উপর থেকে ফেলে দেয়ার ফলে তিন্নির মাথা ও শরীরের অংশ বিশেষ থেঁতলে গিয়েছিল। শরীরের কিছু হাড্ডি গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল।
গোলাম ফারুক অভির টিকিটি কেউ ছুঁতে পারেনি। শোনা গিয়েছিলো অভি কানাডায় পালিয়ে গিয়েছেন। হত্যা মামলা দায়ের হলেও অভিকে কানাডা থেকে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অভির রত্নগর্ভা মা জননীর সন্তানরা লবিং করে তিন্নি হত্যা মামলাকে নিস্ক্রিয় করে দিয়েছেন। যার কারণে তিন্নি হত্যার কোনো বিচার হয়নি।
লেখাপড়ায় অসম্ভব মেধাবী ছিলেন গোলাম ফারুক অভি। এসএসসি এবং এইচএসসিতে বোর্ড পর্যায়ে মেধার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। মেধাবী অভি অনেকটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দিনে দিনে ধাবিত হন পতনের পথে। মূলত এরশাদের শাসনামলেই অভির উত্থান ঘটে। সাবেক জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতা ও পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির এমপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের অস্ত্রবাজ ছাত্র নেতা ছিলেন অভি। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানী ঢাকার মানুষ অভি-নীরু নাম শুনলেই বাঘে মোষে পানি খেত এক ঘাটে। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী নিয়ে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তিনি। পেশীশক্তির মাধ্যমে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে করে তুলেছিলেন তার সন্ত্রাসের তল্লাট। এক সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের হাত ধরে বরিশাল-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। মানুষ মরণশীল কিন্তু তাই বলে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সকল হত্যাই অস্বাভাবিক। মেনে নিতে কষ্ট হয়ে যায়। আজও আফসোস হয় তিন্নির জন্য। আফসোস হয় মুশাররাত জাহান মুনিয়ার জন্য। তিন্নি মুনিয়ারা চোখের পলকে ফাঁদে পড়ে যায়। আর বড্ড অকালে নিজেদের জীবন বলি দিয়ে দেয়।