News Bangla

আজ মহানায়কের জন্মদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মহানায়ক উত্তম কুমারের ৯৫তম জন্মদিন আজ। ভুবন ভোলানো সেই হাসিই ছিল তার অন্যতম পরিচয়। বাংলা সিনেমার এই আইকন আজও বেঁচে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। ভারতীয় অভিনেতা হলেও তিনি ওপার-এপার দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয়।

প্রকৃত নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম চপলা দেবী। তিন সন্তানের মধ্যে উত্তম কুমার ছিলেন সবার বড়ো।

১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। উত্তম কুমার কলকাতার সাউথ সাবার্বা‌ন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরে গোয়েঙ্কা কলেজে ভর্তি হন।

ইন্ডাস্ট্রি তখনও পায়নি মহানায়ককে। সংসারের প্রয়োজনে তিনি তখন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি পান। কেরানির কাজের মধ্যেই আহিরীটোলায় নিজেদের থিয়েটার গ্রুপ ‘সুহৃদ সমাজ’-এ নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন তিনি।

থিয়েটার করতে করতেই স্টুডিও পাড়ায় ডাক পান তিনি। ১৯৪৮-এর ছবি ‘দৃষ্টিদান’-ই তার অভিনীত প্রথম ছবি। কিন্তু শিকে ছিঁড়ল না একেবারেই। বরং তকমা জোটে ‘ফ্লপ মাস্টার’-এর।

এক সময় স্টুডিওপাড়ায় ওই নামেই তাকে চিনতেন সবাই। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একের পর এক সিনেমা করলেও কোনোটাই সফল হয়নি। ১৯৫৩-তে কামব্যাক ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ।

যুগলবন্দি ঘরানার অন্যতম উদাহরণ সত্যজিৎ রায় এবং উত্তমকুমার। উত্তমকুমারকে ভেবেই ১৯৬৬-র ‘নায়ক’ ছবি করার কথা ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ‘নায়ক’ উত্তমের কেরিয়ারের ১১০তম ছবি।

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মোট ২১২টি ছবি করেছেন তিনি। তার সবকটি ছবিই ভারতীয়, বিশেষ করে বাংলা সিনেমার অলঙ্কার।

উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেকগুলি ব্যবসায়িকভাবে সফল এবং একই সাথে প্রশংসিত চলচ্চিত্রে মুখ্য ভূমিকায় একসাথে অভিনয় করেছিলেন। এগুলির মধ্যে প্রধান হলো- হারানো সুর, পথে হল দেরী, সপ্তপদী, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, জীবন তৃষ্ণা এবং সাগরিকা।

উত্তম কুমার বহু সফল বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। তার অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম।

১৯৭৬ সাল। তখন জরুরি অবস্থা চলছে। মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’কে সরিয়ে ‘দেবী দুর্গতিহারিণীম’ নাম দিয়ে এক বিকল্প অনুষ্ঠান হয়েছিল। রেডিওতে সেই অনুষ্ঠান করেছিলেন উত্তম। তবে পর্দায় উত্তম বাঙালির হৃদয়ে বাস করলেও এই ভূমিকায় তাকে মেনে নেয়নি জনতা। উত্তমও সরে দাঁড়িয়েছিলেন বিনয়ের সঙ্গে।

অভিনয় ছাড়াও পরবর্তীতে প্রযোজক, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন উত্তম। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’য় অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। স্ত্রী গৌরীদেবীর মুখের আদলে বাড়ির লক্ষ্মীপ্রতিমার মুখ তৈরি করিয়েছিলেন উত্তম। প্রথম বছর বাড়িতে এসে কুমোর সেই মূর্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ওই রীতি এখনও চালু।

পরবর্তীকালে তিনি গিরীশ মুখার্জি রোডের বাড়ি ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে চলে যান। এই বাড়িতেই থাকতেন সুপ্রিয়া দেবী। তবে প্রতি বছর বিয়ের তারিখ এবং জন্মদিনে প্রত্যেক বার গৌরীদেবীকে বেনারসি শাড়ি, সোনার গয়না উপহার দিতেন তিনি।

পেশাগত কারণে কারও সঙ্গে তাঁর রেষারেষি ছিল না। বরং বাংলা ছবির দুই নক্ষত্র উত্তম এবং সৌমিত্র ছিলেন একে অন্যের গুণমুগ্ধ। ‘প্রতিশোধ’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘পক্ষীরাজ’, ‘দেবদাস’, ‘যদি জানতেম’, ‘নকল সোনা’, ‘স্ত্রী’, ‘অপরিচিত’, ‘ঝিন্দের বন্দি’- এই ন’টি ছবিতে এক সঙ্গে কাজ করেছিলেন তারা।

সাতের দশকের শেষ দিক। তখন উত্তম খ্যাতির মধ্যগগনে। এক দিন হঠাৎ কথাপ্রসঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘‘দূর আর ভাল লাগছে না!’’ সৌমিত্র তখন তাঁকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘‘বুড়োর রোলগুলো করতে হবে না? এখন থেকেই ভাল না লাগলে হবে? আপনি আর আমি বুড়ো না হলে ইন্ডাস্ট্রিতে ভাল বুড়ো পাওয়া যাবে না!’’পশুনে হাসতে শুরু করেছিলেন উত্তম কুমার।

না! মহানায়কের আর বুড়ো হয়ে ওঠা হয়নি। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ‘ওগো বধু সুন্দরী’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীনই তার স্ট্রোক হয়। বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাচানো যায়নি। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই রাতে তার মৃত্যু হয়। সূত্র-একাত্তর টিভি।